একরাশ শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন আপনার যাত্রা শুভ হোক আপনার কাঙ্খিত অফিশিয়াল রেজিস্ট্রেশন লিংকটি পাওয়ার জন্য প্রথম পোষ্টের মধ্যে ক্লিক করুন | প্রথম বার ক্লিক করলে আপনাকে কোন এডের সাইডে নিয়ে যেতে পারে | অবশ্যই সেখান থেকে ব্যাক এসে আবার ক্লিক করুন তাহলে আপনার কাঙ্খিত লিংকটি পেয়ে যাবেন | ধন্যবাদ আপনাকে আমাদের সাইট ভিজিট করার জন্য |

আরিশা হৃদয়ের দিকে মায়াবী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।আরিশা হৃদয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, হাই। আমি আরিশা।

Top Ads

আরিশা হৃদয়ের দিকে মায়াবী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।আরিশা হৃদয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, হাই। আমি আরিশা।



আরিশা হৃদয়ের সামনে আসতেই আরিফুল হৃদয়কে দেখিয়ে বললেন,

->মা এ হচ্ছে হৃদয়।ওর সাথে পরিচয় হও।

আরিশা হৃদয়ের দিকে মায়াবী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।আরিশা হৃদয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,

->হাই।আমি আরিশা।

হৃদয় কাঁপা কাঁপা হাতে আরিশার হাত ধরলো।হৃদয় বেশ কাঁপা কন্ঠে বলল,

->আমি হৃদয়।

হৃদয় আরিশার হাত ছেড়ে দিলো।আরিশা রহস্যময় ভাবে হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলল,

->আপনি তো দেখছি মেয়েদের প্রচন্ড লজ্জা পান।আপনার মতো পুরুষ কিন্তু সচারাচর খুব একটা দেখা যায় না।

হৃদয় কোনো জবাব দিলো না।শুধু মুচকি হাসলো।সে যেন একরকম ঘোরের মধ্যে পড়ে আছে।প্রথমবারের মতো কোনো নারীর ছোঁয়া ওকে সম্পূর্ণ ঘোরের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

আরিফুল আরিশা'কে বলল,

->মামুনি তুমি কি কোথাও যাচ্ছো?

->আসলে বাবা আমি তোমায় বলেছিলাম না,আজ আমার এক বান্ধবীর সাথে মার্কেটে যাবো।ওর বাবুর জন্য কিছু কেনাকাটা করবে তো সেজন্য আমায় একটু ডেকেছে।

->ঠিক আছে মা যাও।তবে আজ বিকেলে তৈরি থেকো,আজ তোমায় দেখতে আসবে।

আরিশার বোধ হয় এই কথাটি শুনতে ভালো লাগলো না।কেননা সে কোনো কথা না বলে সোজা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো।হৃদয় আরিশার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে

আরিফুল দীর্ঘশ্বাস ফেললো।হৃদয় আরিফুলে দিকে তাকিয়ে বলল,

->আমার মনে হয়,আরিশার বিয়ের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই,ওর অবস্থা দেখে আমার যা মনে হলো আর কি?ওর আবার কোনো পছন্দের মানুষ নেই তো?

->না বাবা এরকম কেউ নেই।কারন থাকলে সে আমায় ঠিকই জানাতো।আরিশার মা মারা যাবার পর থেকে আমিই ওর মা,আমিই ওর বাবা।এমন কোনো কথা নেই যা সে আমার সাথে শেয়ার করেনি।

->আচ্ছা আপনি বললেন,আজ বিকেলে ওকে দেখতে আসবে,কিন্তু আপনি তো জানেন আমার পরিবারে বর্তমানে আমি শুধু একা।তাহলে এই কথা বললেন কেন?

->আসলে বাবা যে দেখতে আসবে সে তুমি নও সে অন্য একজন।

এবার হৃদয় বেশ অবাক হয়ে বলল,

->আপনি নিজেই বললেন,আমার সাথে আপনার মেয়ের বিয়ে দিবেন এখন আবার বলছেন অন্য কেউ দেখতে আসবে?এসবের মানে কি?আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।আপনি আসলে চাইছেন কি বলুন তো?

->তুমি একটু শান্ত হয়ে বসো আমি তোমায় সব জানাচ্ছি।আমি জানি যে আজ যে ওকে দেখতে আসবে ওর অবস্থাও আগের ছেলেদের মতোই হতে পারে।

->মানে?

->তোমায় সবটা বলি শোনো।আমার মেয়ের বয়স যখন ১৮-১৯ বছর তখন থেকে আমার পরিচিত লোকজনের কাছে থেকে আরিশার বিয়ে প্রস্তাব আসতে থাকে।কিন্তু আমি এত অল্প বয়সে মেয়েকে বিয়ে দিতে চাইনি।এই সময় পর্যন্ত আরিশা একদম ঠিক ছিলো।সমস্যা শুরু হয় দুই বছর আগে থেকে।দিনটি ছিলো ৭ই মার্চ।আরিশার বাইশ তম জন্মদিন।

সেদিন আমার এক বন্ধু আরিশাকে দেখার পর অনেক পছন্দ হয়।আরিশাকে তার একমাত্র ছেলের বউ বানাতে চায়।আমার বন্ধু বলতে গেলে অনেক বড়লোক।সমাজে নামযশ,প্রভাব-প্রতিপত্তি সবই আছে।তার এই প্রস্তাবে আমি আপত্তি করিনি।তারা চেয়েছিলো আরিশার জন্মদিনের দুইদিন পর এনগেজমেন্ট করে রাখবে।কিন্তু আরিশা যেহেতু কিছু জানে না তাই আমি এতে আপত্তি জানায়।তাই ওরা সিদ্ধান্ত নেয়,এক সপ্তাহ পর ওরা তার একমাত্র ছেলে ফাহাদকে নিয়ে আরিশাকে দেখতে আসবে।তারপর দিন-তারিখ ঠিক করে অনুষ্ঠান করে এনগেজমেন্ট সম্পূর্ন করবেন।আর মাস তিনেক পর বিয়ে দিবেন।আমি তাদের সিদ্ধান্তে মত দিই।আমি আরিশাকে বিয়ের ব্যাপারে জানায় সে কোনো জবাব দেয়না।

তো দুইদিন পর আমার বন্ধু তাদের একমাত্র ছেলে ফাহাদ'কে নিয়ে আমাদের বাসায় আসে।আমি আরিশা'কে ফাহাদের মুখোমুখি বসায়।ফাহাদ আরিশার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।তখন আরিশা ফাহাদ'কে প্রশ্ন করে বসে,

->আমি আপনার লিস্টে কত নাম্বার মেয়ে মিস্টার ফাহাদ?

আরিশা'র এই প্রশ্নে ফাহাদ সহ আমরা সকলে চমকে যাই।সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে।তখন ফাহাদ বেশ কাঁপা কন্ঠে বলে,

->মানে?

->মানে আমার আগে আপনার আরো কতজন মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিলো?

ফাহাদ হেসে জবাব দেয়,

->আপনি আমার জীবনে প্রথম।

এই কথা শুনে আরিশা প্রচন্ড রেগে যায়।আরিশা টেবিলের ওপরে থাকা কাঁচের গ্লাস তুলে ফাহাদের মাথায় মেরে দেয়।আরিশার এমন কান্ডে আমরা সকলে চমকে উঠি।গ্লাসের আঘাতে ফাহাদে কপালে ফেটে রক্ত বের হতে শুরু করেছে।আরিশা রাগে ফুসতে থাকছে।আমি লক্ষ্য করি আরিশা রাগে কাঁপতেছে।পুরো চেহারা যেন মুহুর্তে পাল্টে গেলো।বিশ্বাস করো,আমায় মেয়েকে তার জন্মের পর থেকে এমন অবস্থায় কখনো দেখিনি।'

হৃদয় বেশ আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করলো,

->তারপর কি হলো?

->আরিশা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে,"আমার সামনে মিথ্যা বলিস,বলছি চলে যা এখান থেকে নয়তো আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না"।

আরিশার এমন কথায় ফাহাদের মা রেগে গিয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে,

->আগে যদি জানতাম,আপনার মেয়ে এতটা বেয়াদব তাহলে কখনো বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসতাম না।

তখন আমি তাদের কিছু বলতে যাবো,তখন আরিশা আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে,

->আমায় বেয়াদব বলার আগে,নিজের ছেলের বিষয়ে জেনে দেখুন সে কতবড় বেয়াদব।নিজের ছেলের দোষ ঢেকে আসছে অন্যের মেয়ের দোষ ধরতে।এখনি আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।

এই বলে আরিশা,ওরা যে সোফায় বসে ছিলো,সে সোফা থেকে ওরা উঠার আগেই সে নিজে দুই হাতে সোফা টান দিয়ে সোফা দুরে ছুড়ে ফেলে।এটা দেখে ওরা ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে চলে যায়।এদিকে আমার মেয়ের এমন কান্ড দেখে আমি নিজেই বেশ অবাক হয়ে যাই।যে সোফা দুইজন মিলে তুলতে পারে না,সে সোফা আমার মেয়ে একা কিভাবে ছুড়ে মারতে পারে?আরিশার শরীরে এত শক্তি এলো কি করে?

হৃদয় আরিফুলের কাছে থেকে এসব কথা শুনে বেশ অবাক হয়ে যায়।আবার কথাগুলো তেমন বিশ্বাসও করতে পারছে না হৃদয়।মনে মনে ভাবে,"শেষমেষ কোনো তাড় ছিঁড়া লোকের পাল্লায় পড়লাম না তো আবার?কিন্তু ওদের চালচলন কথা-বার্তা থেকে কিছু বোঝার উপায় নেই"।

তবে হৃদয় লক্ষ্য করছিলো,আরিফুল যখন কথা গুলো বলছিলো তখন সে বেশ ঘাবড়ে ছিলো।কপালে বিন্দু বিন্দু জল দেখা যাচ্ছে।বোঝা যাচ্ছে,এই ঘটনায় তিনি কতটা ঘাবড়ে ছিলেন বা আছেন।

হৃদয় আবার জিজ্ঞেস করলো,

->আরিশা এমন কেন করলো এই ব্যাপারে ওকে কিছু বলেন নি?

->বলেছিলাম।যখন আরিশা শান্ত হয়ে যায় তখন আমি ওকে জিজ্ঞেস করি,

->আরিশা ওদের সাথে তোমার এমন করার কারন কি?

আরিশা আমার কথার কোনো জবাব দেয়না।চুপ করে বসে থাকে।আমি তখন একটু ধমকের সুরে বলি,

->কি বলছি,কানে যাচ্ছেনা।

আমার কথায় আরিশা কেঁপে উঠে।আর তখনি আমাকে জড়িয়ে কান্না করে দেয়।মেয়ের কান্না দেখে আর কিছু বলতে পারিনি।তখন আরিশা কান্না করতে করতে বলে,

->জানো বাবা ওরা না খুব খারাপ।ওরা আমায় শান্তিতে থাকতে দিতো না।তাই আমি চাইনি ওই ছেলেকে বিয়ে করতে।

আরিশার এই কথা শুনে আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলি,

->তো এটা শান্ত ভাবে বললেই পারতে,এমন কান্ড করার কি কোনো দরকার ছিলো?

আরিশা আর কোনো জবাব দেয়না।আর তারপরেই ঘটে আরেকটি ভয়ানক ঘটনা।

->কি ঘটনা?

->সেদিন রাতে ফাহাদ গলায় দড়ি দিয়ে আত্মাহত্যা করে।গলায় দড়ি দেওয়ার আগে নিজের শরীরের ওপর প্রচন্ড টর্চার করে।ব্লেড দিয়ে কেটে সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলে।আর তারপর গলায় দড়ি দেয়।চিঠিতে লিখে যায়,

"আজ পর্যন্ত আমি মেয়েদের সাথে অনেক খারাপ কাজ করেছি।আর আজ এসব কাজ করা কারনে নিজের মধ্যে খুব অনুশোচনা হচ্ছে।এসব আমি আর নিতে পারছি না তাই নিজেই নিজেকে শেষ করে ফেললাম।আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়"।

আর শুধু ফাহাদ নয়,এরকম আরো কয়েকজন আমার মেয়েকে দেখতে এসেছে।তাদের সবার সাথে আরিশা ফাহাদের মতোই কাজ করেছে।প্রথমে ছেলের দোষ তুলে ধরেছে আর তারপর যেকোনো জিনিস দিয়ে আঘাত করেছে।আর তারাও সেদিন রাতে অনুশোচনাগ্রস্ত অবস্থায় বিভিন্ন উপায়ে আত্মাহত্যা করেছে।

তারপর আরিশার এই ব্যাপারটি জানাজানি হয়ে যায় যে," আমার মেয়েকে যে দেখতে আসে তারই মৃত্যু হয়"।তখন থেকে আর কোনো প্রস্তাব আসেনা।এতদিন পর আবার একটা প্রস্তাব আসছে জানি না ওর সাথে কি ঘটবে।

->ব্যাপারটা এবার সত্যিই আমার কাছে রহস্যময় লাগছে।আচ্ছা এবার যে দেখতে আসবে তার সাথেও যদি এমনটা ঘটে তাহলে?আপনি জেনে শুনে কেন আসতে বলছেন?

->ওরা দেখার জন্য খুব জোরাজোরি করছিলো তাই আসতে বলেছি।ছেলে নাকি কোথায় আরিশা'কে দেখে পছন্দ করে ফেলেছে।আর সে থেকে বাবা-মার সাথে জোরাজোরি করছে।

->ও বুঝলাম।আচ্ছা আরিশা লোকগুলোর ব্যাপারে যা বলেছে সব সত্যি ছিলো?

->হয়তো।

->আরিশা এসব জানতো কি করে?

->এটা কখনো বলেনি।যতবার জানতে চেয়েছি ততবার সে নিশ্চুপ থেকেছে।কোনো উত্তর ওর কাছে থেকে পাইনি।এমনকি কলেজে যে ছেলে ওর কাছাকাছি আসতে চেয়েছে তার সাথে খুব বাজে বিহেব করেছে।

->এর থেকে বোঝা যাচ্ছে,কোনো কারনে আরিশার পুরুষের প্রতি তিক্ততার জন্ম নিয়েছে।কিন্তু সে তিক্ততার কারন কি হতে পারে?

->এটা তোমার ওর কাছে থেকে জানতে হবে।

->আমি কি করে জানবো?যেখানে সে কোনো ছেলেকে সহ্য করতে পারেনা সেখানে আমাকে যে সব বলবে এর তো কোনো গ্যারান্টি নেই।

->তা আমি বলতে পারবো না।মনে করো এটায় তোমার একমাত্র কাজ।আর এই কাজের বিনিময়ে তোমায় এই টাকাগুলো দিলাম।

->তাহলে বিয়ের কথা বলেছিলেন এটা?

->যদি আরিশা তোমায় বিয়ে করতে চায় তাহলে আমি বিয়ে দিবো।তার আগে নয়।কারন আমি চাই না,তোমার কোনো ক্ষতি হোক।

->আমার ক্ষতি হবে কেন?

->এতকিছু শোনার পরও বলছো ক্ষতি হবে কেন?যদি আরিশা তোমার ব্যাপারে এমন কিছু বলে যার কারনে তুমি অনুশোচনায় পড়ে এমন আত্মহত্যা করো তখন?




হৃদয় মনে মনে ভাবছে,"আমি এমন কিছু করিনি যার কারনে অনুশোচনায় আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত নিবো।একমাত্র নিজের বাবার প্রতি খেয়াল রাখিনি।এর জন্য অনুশোচনা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু নিজের বাবার প্রতি এখন যে কর্তব্য আছে সেটা পালন করতে পারলে,নিজেকে অনুশোচনার জগৎ থেকে বের করতে পারবো।তাহলে আত্মহত্যা করতে যাবো কেন?"।

হৃদয়ের মনে হচ্ছে,"এসব আত্মহত্যার পিছনে নিশ্চয় অন্য কারন আছে যা ওর খুজে বের করতেই হবে।আর খুজে বের করতে পারলে আরিফুলের কাছেও আর ঋণী থাকবে না সেই সাথে বাবার প্রতি সন্তান হিসেবে যে কর্তব্য সেটাও পুরোপুরি পালন করতে পারবে"।

আরিফুল ওর পকেট থেকে চেকবই বের করে সেখান থেকে সর্বোমোট তের লক্ষ টাকার একটি চেক হৃদয়ের হাতে দিয়ে বলল,

->তোমার বাবার যা ঋণ আছে সব মিটিয়ে দাও।

হৃদয় অবাক হয়ে বলল,

->আমার তো বারো লক্ষ টাকা লাগবে আপনি তো এক লক্ষ টাকা বেশি দিয়েছেন।এতটা আমার প্রয়োজন।

->সমস্যা নেই রেখে দাও কাজে লাগবে।

হৃদয় আর কোনো জবাব দিলো না।হৃদয় আরিফুলের বাড়ি থেকে বের হয়ে এলো নিজের বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্য।

হৃদয়ের চোখের সামনে বার বার আরিশার চেহারা ভেসে উঠছে।আরিশার সাথে হাত মেলানোর ব্যাপারটি বার বার মনে হচ্ছে।একটা মেয়ের সাথে হাত মেলানোর অনুভূতি যে এতটা সুন্দর হতে পারে তা হৃদয় কখনো কল্পনা করেনি।যতক্ষণ আরিশা হৃদয়ের হাত ধরে ছিলো ততক্ষণ মনে হচ্ছিলো,কোনো উষ্ণ মাখনের সাথে ওর হাত লেগে আছে।ব্যাপারটি মনে হতেই হৃদয়ের হাসি পেলো।আরিশার হাসি,তার কথা বলার ধরন সবকিছুতে যেন অজানা রহস্য মিশে আছে।আবার তার ব্যাপারে এতকিছু শোনার পর অস্ফুট স্বরে হৃদয়ের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো,'সত্যি তুমি এক রহস্যময়ী নারী'




পর্ব :- ৩




আরিশা ওর বান্ধবি মেঘলার ছেলেকে কোলে নিয়ে আছে।মাঝেমধ্যে ওর ছেলেকে খুব আদর করছে।মেঘলা কেনাকাটা করছে।কেনাকাটা শেষে মেঘলা আরিশার কাছে এলো।আরিশাকে বলল,

->যাক বাবা এতক্ষণে কেনাকাটা শেষ হলো।

->হুমম।তোর বাবুটা অনেক শান্ত রে।এত সময় ধরে কোলে নিয়ে আছি কোনো দুষ্টুমি করেনি।

->বলিস কি?ওর দুষ্টুমির কারনে আমি একা কোথাও যেতে পারিনা আর তুই কি না বলছিস সে কোনো দুষ্টমি করেনি?

->বাচ্চাদের কি করে শান্ত রাখতে হয় এর উপায় আমার খুব ভালো করে জানা আছে বুঝলি।এজন্য তোর বাবু কোনো দুষ্টমি করেনি।

->তো তুই বাচ্চার আম্মু কবে হবি শুনি?

আরিশা নিশ্চুপ দাড়িয়ে আছে।কোনো কথা বলছে না।মেঘলা আবার জিজ্ঞেস করলো,

->চুপ করে আছিস কেন?তোর মা ডাক শুনতে ইচ্ছা করেনা?

->হুম করে।কিন্তু কোনো পুরুষ জাতির আমার বিশ্বাস নেই।সবাই খু্ব খুব খারাপ।সংসার জীবনে এরা মেয়েদের ওপর খুব টর্চার করে।

মেঘলা দেখলো আরিশা চোখেমুখে দুঃখের ছাপ।তা দেখে বলল,

->তুই এমন ভাবে কথা বলছিস যেন তুই একটা সংসার করে এসেছিস?

মেঘলার কথায় আরিশা চমকে উঠলো।তারপর হেসে উঠে বলল,

->ধুর কি যে বলিস।আমার তো বিয়েই হলো না আর সংসার?

->আর বিয়ে হবে কি করে যে তোকে দেখতে আসে তার সাথে যেসব কান্ড করিস,তাতে আর কে বিয়ে করবে?আচ্ছা তুই এদের ব্যাপারে যে সমস্ত কথা বলিস সেগুলো কি আসলেই সত্যি হয়?

->সত্যি না হলে অনুশোচনায় কেউ আত্মাহত্যা করে?

->জানিস কি করে এসব কথা?

আরিশা মুচকি হাসি দিয়ে বলল,

->সিক্রেট।এখন চল দেরি হয়ে যাচ্ছে।

আরিশা মেঘলা'কে সাথে নিয়ে মার্কেট থেকে বেরিয়ে এলো।এমন সময় ওদের সামনে পরাগ নামের একটা ছেলে এসে দাড়ালো।পরাগ আরিশার পিছনে প্রায় ঘুর ঘুর করে।পরাগ আরিশার দিকে তাকিয়ে বলল,

->কি গো দুই সুন্দরী কোথায় গিয়েছিলে?

আরিশাঃ-সেটা কি তোকে বলতে হবে?

পরাগঃ-আচ্ছা তুমি সবসময় এমন কঠিন হয়ে কথা বলো কেন?তোমার মতো সুন্দরী মেয়ের মুখে কঠিন কথা মানায় না।

আরিশাঃ-তুই আমার সামনে থেকে সরবি নাকি নিজে সরিয়ে দিবো?

পরাগঃ-তোমার নরম হাত-খানা দিয়ে সরে দাও।

আরিশার চোখ নিমেশে রক্ত বর্ণ হয়ে উঠলো।রাগে হাত-পা রীতিমতো কাঁপতে শুরু করেছে।আরিশা রাস্তার পাশে পড়ে থাকা একটা ইট তুলে পরাগের কান বরাবর জোরে আঘাত করলো।পরাগ চিৎকার দিয়ে মাটিতে পড়ে গেলো।আরিশার এমন কান্ড দেখে মেঘলা সহ আশেপাশের সব মানুষ অবাক।মেঘলা বলল,

->তুই একে মারলি?

->এমন শয়তানি মার্কা কথা বললে কি ছেড়ে দিবি?এখানে আর না থেকে চল।

আরিশা নিজের মনে চলে যেতে লাগলো।ওর পিছু পিছু মেঘলা যাচ্ছে।আশেপাশের লোকজন অবাক চোখে আরিশার দিকে তাকিয়ে আছে।

আরিফুল দুর থেকে মেয়ের এমন কান্ড দেখলেন।মনে মনে ভাবছেন,"আমার মেয়ের এসব কাজের জন্য না জানি আরো কত খেসারত আমায় দিতে হবে"।

মেঘলা আরিশা'কে জিজ্ঞেস করলো,

->তুই আজ থেকে দুই বছর যাবৎ বেশ রহসময়ী হয়ে উঠেছিস।আগের চেয়ে একেবারে অন্যরকম হয়ে গেছিস।

->কি রকম?

->এই যে,আগে কতটা শান্ত ছিলি।সবার সাধারন কথায় একদম গলে যেতি।কিন্তু এখন?

->সবসময় যদি শান্ত থাকিস তাহলে সবাই তোকে মোম ভেবে গলে ফেলবে।আর যদি পাথর হয়ে যাস তাহলে কেউ সহজে তোকে ভাঙ্গতে পারবেনা।

->ঠিকই বলেছিস।




হৃদয় ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বাসায় এলো।হৃদয়ের বাবার কাছে থেকে যারা টাকা পেতো,হৃদয় সবার টাকা পরিশোধ করে দিলো।এত তাড়াতাড়ি হৃদয়কে এত গুলো টাকা দিতে দেখে সকলে বেশ অবাক।অনেকে অনেক কথা বলতে লাগলো।সবার মনে একই প্রশ্ন,"হৃদয় এত তাড়াতাড়ি এত গুলো টাকা পেলো কোথায় থেকে?"

হৃদয় সবাইকে একটা জবাব দিলো,"টাকা কোথায় পেয়েছি না পেয়েছি এটা সবার না জানলে চলবে,আপনারা আপনাদের টাকা পেয়ে গেছেন ঝামেলা মিটে গেছে"।

সব টাকা পরিশোধ করার পর হৃদয় দীর্ঘশ্বাস ফেললো।যাক সে সন্তান হিসেবে বাবার জন্য কিছু করতে না পারলেও তার বাবা ঋণ তো পরিশোধ করতে পেরেছে।হৃদয় আরিফুল কে ফোন করলো।আরিফুল হৃদয়ের ফোন রিসিভ করে বলল,

->হ্যাঁ হৃদয় বলো?ওই দিকে সব সমস্যা মিটে গেছে?

->হ্যাঁ আংকেল সব ঝামেলা মিটে গেছে।এখন বলুন আমায় কি করতে হবে?

->তুমি আমার বাসায় চলে এসো।আমি এখন আপাতত একটা মিটিংয়ে অংশ নিচ্ছি।তাই বেশি কিছু বলতে পারবো না।

->আচ্ছা।

হৃদয় আবার আরিফুলের বাসার উদ্দেশ্য রওনা দিলো।মনে মনে ভাবছে,"আরিফুল তো ওর মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে চেয়েছিলো,কিন্তু এখন একটা কাজ দিয়েছে,সেটা হলো ওর মেয়ের রহস্য বের করার।কিন্তু আরিশাকে তো ওর খুব ভালো লেগেছে।যদি সত্যি মেয়েটাকে নিজের করে পেতাম"।

পরক্ষণেই হৃদয় ভাবলো,কাউকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা ঠিক নয়,কারন কাউকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার পর যদি সে স্বপ্ন পূরন না হয় তাহলে অনেক কষ্ট পেতে হবে"।

হৃদয় যখন আরিফুলের বাসায় পৌছালো তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা"।

হৃদয় গেটের সামনে দাড়াতেই দারোয়ান দরজা খুলে দিলো।হৃদয় বাড়িতে প্রবেশ করা মাত্রই দারোয়ান বলল,

->স্যার আপনাকে ভিতরে অপেক্ষা করতে বলেছেন।উনার আসতে দেরি হবে।

হৃদয় বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।মনে মনে ভাবছে,"আজ তো উনার মেয়েকে দেখতে আসার কথা ছিলো,ওরা কি আজ আসবে না নাকি?আসলে হয়তো এতক্ষণে আসতো আর নয়তো এসে দেখে চলে গেছে।কেননা সে তো অনেক সময় এখানে ছিলো না তাই জানবে কি করে,তারা এসেছিলো নাকি আসেনি?"

হৃদয় বাড়ির মধ্যে যাওয়ার সাহস করলো না।বাড়ির সামনে পায়চারি করছে।এমন সময় ছাদ থেকে আরিশা বলল,

->এই যে মিস্টার হৃদয় ওখানে দাঁড়িয়ে পাইচারি করছেন কেন?ছাদে আসুন।

হৃদয় আরিশার দিকে তাকালো।কোনো কথা বলছেনা হৃদয়।তখন আরিশা বলল,

->আচ্ছা থাকুন আমি আসছি।

একটু বাদে আরিশা ছাদ থেকে নেমে এলো।আরিশা হৃদয়ের সামনে এসে দাড়িয়ে মুচকি হাসি দিলো।আরিশার হাসি দেখে হৃদয়ের মনের মধ্যে এক অন্যরকম অনুভূতি খেলা করছে।

আরিশা বলল,

->একা আসতে তো ইতস্তত বোধ করছেন তাই আমার সাথে আসুন।

হৃদয় বেশ অবাক হলো।কেমন করে জানি আরিশা ওর মনের কথাটা জানতে পারলো।

হৃদয় মুখে কোনো কিছু প্রকাশ না করে আরিশার পিছু পিছু ছাদে উঠলো।ছাদে এসে আরিশা এক কোণে গিয়ে দাড়ালো।হৃদয় ছাদের দরজার কাছে দাড়িয়ে আছে।আরিশা হৃদয়ের দিকে ঘুরে দাড়িয়ে বলল,

->ওখানে দাড়িয়ে আছেন কেন,এখানে আসুন।

আরিশা হৃদয়কে ডাকায় সে বেশ ধীর পায়ে আরিশার কাছে গিয়ে দাড়ালো।হৃদয় বেশ দুরত্ব বজায় রেখে দাড়িয়ে আছে।আরিশা হেসে উঠে বলল,

->প্রথমবার নারী সঙ্গ পাচ্ছেন তো তাই এমন আনইজি ফিল হচ্ছে।দেখবেন আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।

হৃদয় আবারো অবাক চাহনি নিয়ে আরিশার দিকে তাকালো।আরিশা মায়াবী দৃষ্টিতে হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।কেন জানি মনে হচ্ছে,"আরিশা এক দেখাতেই ওর ভিতরটা একদম পড়ে ফেলেছে,তাই তো সে হৃদয়ের মনের কথা নিজে প্রকাশ করছে"।

আরিশা আনমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।হৃদয় কোনো কথা বলছে না।মাঝেমধ্যে আড়চোখে আরিশাকে দেখছে।উদাসিন অবস্থায় যখন কোনো মেয়ে একমনে কোনো দিকে তাকিয়ে থাকে তখন তাকে দেখতে খুব মায়াবী লাগে।যেমনটা আরিশাকে লাগছে।আরিশা বলল,

->জানেন আমি প্রতিদিন এই সময়টায় নিজেকে বেশি একা অনুভব করি।

হৃদয় হালকা কেশে বলল,

->এটা তো আপনার দোষে।আপনি চাইলে এরকম একা থাকতে হতো না।এই সময় একজন সঙ্গী আপনার পাশে থাকতো।

->হুমম।কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য কোনো সঙ্গী খুঁজে পাইনি।আর বিশ্বাসযোগ্য কেউ নেইও আজকাল।

->হুম তা ঠিক।একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?

->হুমম করুন।

->আপনাকে দেখতে আসলে আপনি তাদের গোপন ব্যাপার গুলো তুলে ধরতেন আর তারা সেসব কিছুর কারনে অনুশোচনাগ্রস্ত হয়ে আত্মাহত্যা করতো।আপনি ওদের গোপন বিষয় জানতেন কি করে?

আরিশা হাসলো।তারপর বলল,

->আন্দাজে ঢিল ছুড়তাম,ফলে লেগে যেত।আর তখনি গাছ থেকে ফল মাটিতে ঝরে পড়তো।

কথাটা হৃদয়ের বিশ্বাস হলো না।এর পিছনে অন্যকোনো বড় রহস্য নিশ্চয় আছে।কিন্তু সেটা কি?

হৃদয় বলল,

->আজ আপনাকে একজন দেখতে আসার কথা ছিলো?

->সামনে সপ্তাহে আসবে।ওর মৃত্যুর তারিখ পিছিয়ে গেলো।ব্যাপারটা ভালো লাগলো না আমার।

->মানে কি?

->আগের বার যারা এসেছিলো,তাদের সাথে যা হয়েছে ওর সাথেও তাই হতো।

হৃদয় কোনো কথা বলছে না।আরিশা হাসছে।হৃদয় মেয়েটাকে যত দেখছে,ওর কাছে সে ততটা রহস্যময় হয়ে উঠছে।

আরিশা হৃদয়কে বলল,

->ওদের মতো তোমার মধ্যে তোমার বাবার জন্য অনুশোচনা কাজ করছিলো।তুমি চাইলে আত্মাহত্যা করতে পারতে কিন্তু করো নি,কারন তুমি হলে বাস্তবতাবাদী।তুমি বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছো।সন্তান হিসেবে দায়িত্ব পালন করার জন্য নিজের কথা না ভেবে বাবার দেওয়া প্রস্তাব মেনে নিয়েছো।সত্যি তোমার মতো ছেলে আজকাল খুব কম।মন থেকে বলছি,আই লাইক ইউ।

হৃদয় আরিশার দিকে তাকিয়ে আছে।তারমানে মেয়েটা ওর ব্যাপারে খুটিনাটি সবই জানে।কিন্তু কি করে একজন সাধারন মেয়ের পক্ষে এত কিছু জানা সম্ভব?

এমন সময় গাড়ির আওয়াজ এলো।আরিশা বলল,

->নিচে চলো বাবা এসেছে।

আরিশা হৃদয়কে নিয়ে নিচে চলে এলো।আরিশা ওর বাবা'কে বলল,

->জানো বাবা,আমার না হৃদয়'কে খুব ভালো লেগেছে।সত্যি সে অন্য সবার থেকে একদম আলাদা।

আরিফুলঃ-তাহলে হৃদয়কে তোমার লাইফ পার্টনার করে নাও।

এই কথায় আরিশার মুখে লজ্জার আভা ফুটে উঠলো।আরিফুল এই প্রথম মেয়ের মুখে এমন লজ্জার আভা ফুটে উঠে দেখলেন।আরিশা কিছু না বলে দৌড়ে উপরে চলে গেলো।হৃদয় আরিশার দিকে তাকালো।তখন আরিফুল বলল,

->কপালে থাকলে আমার মেয়েকে সারাজীবন ধরে এভাবে দেখতে পাবে।

হৃদয় একটু লজ্জা পেলো বটে তবে স্বাভাবিক হয়ে রইলো।আরিফুল বলল,

->আরিশার থেকে কিছু জানতে পারলে?

->এখন পর্যন্ত না।তবে জানতে পারবো মনে হয়।

->হুমম চেষ্টা চালিয়ে যাও।

রাতের বেলা হৃদয় আরিফুলের বাসায় থেকে গেলো।কারন আরিফুল নিজে হৃদয়'কে থাকতে বলেছে।হৃদয় নিচতলার একটা গেস্টরুমে শুয়ে আছে।বার বার শুধু আরিশার কথা ভাবছে।মেয়েটাকে সে যত দেখছে তত অবাক হচ্ছে।কি করে একটা সাধারন মানুষ কারো মনের কথা বুঝতে পারে?এটা ভাবতেই হৃদয়ের বেশ অবাক লাগছে।আরিশা কি সত্যিই সাধারন মানুষ?নাকি ওর মাঝে লুকিয়ে আছে অসাধারণ অদেখা কোনো চরিত্র?




চলবে,,,,।

Post a Comment

0 Comments